অর্ধাঙ্গিনী | লেখক-অংকুর রায় অনিক

অর্ধাঙ্গিনী -এটা হয় না, হাসিব। তােমার এবং আমার সম্পর্ক কেউ মেনে নিবে না।

-আমরা চাইলেই এটা সম্ভব, পারভিন।

-তুমি অবুঝের মতাে কথা বলছাে, হাসিব।এটা বাংলাদেশ, সেটা তােমাকে বুঝতে হবে।

-আমি এতাে কিছু বুঝতে চাই না। আমি শুধু তােমাকে ভালােবাসি আর তােমাকেই আমার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে চাই ।

-তুমি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। দেশের শীর্ষ স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করেছে। এখন ভালাে একটি চাকরি করছাে। তুমি অনেক ভালাে জীবনসঙ্গীনী পাবে। কেন আমাকে বিয়ে করে নিজের সুখী জীবনকে বিসর্জন দিতে চাইছাে! আমিও তােমাকে ভালােবাসি কিন্তু আমরা বন্ধু হিসেবেই ঠিক আছি। অন্য কোনাে সম্পর্ক আমাদের জন্য নয়। আমার জন্মই হয়েছে দূরে থাকার জন্য, আমি কারাে কাছে থাকার যােগ্য নই।

– তুমি কেন নিজেকে নিয়ে এমন ভাবাে পারভিন! আমি কি তােমার যােগ্য নই?

-কি বলছাে তুমি এসব! আমার মতাে একজন রাস্তার আবর্জনার বন্ধু হয়েছাে তুমি। এটাই তাে আমার জন্য স্বর্গসুখ । তােমার জীবনসঙ্গীনী হওয়ার মতাে এতাে মহাসুখের কথা, কখনাে কল্পনাও করতে পারি না। সবার কপালে সব সুখ সয় না। তুমি আবেগের বশে আজ আমাকে বিয়ে করতে চাইছাে। কাল যখন লােকে তােমাকে ধিক্কার জানাবে তখন তুমি বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে অনেক কষ্ট ভােগ করবে। এই সমাজ তােমার মতাে করে ভাবে না, হাসিব।

-আমি তােমাকে বিয়ে করবাে এবং এই সমাজের অন্ধত্বকে ভেঙে দিবাে আমার ভালােবাসার শক্তিতে

-সমাজের কথা বাদ দিলাম। তােমার বাবা-মা কি মানবে। আমাদের বিয়ে? তারা কত স্বপ্ন দেখে তােমাকে নিয়ে। তাদের তাে ইচ্ছা আছে নাতি-নাতনির মুখ দেখার। তুমি কেন বঞ্চিত করবে তাদেরকে! তারা কি পারবে মানুষের ধিক্কার সহ্য করতে? এভাবে বাবা মাকে তােমার কষ্ট দেওয়া উচিত নয়।

-তারা কষ্ট পাবে না। আমার বাবা মা জানে যে তাদের ছেলে কখনাে ভুল কাজ করতে পারে না। আমরা কোনাে সন্তানকে দত্তক নিয়ে তাদের মনের আশা পূরণ করবাে। প্লিজ তুমি আমার জীবনসঙ্গীনী হও। তােমাকে না পেলে আমি সত্যিই কিছু একটা করে বসবাে।

-আচ্ছা, তুমি যদি নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে চাও তবে মারাে। পরের দিন কোর্ট ম্যারেজ করে বিয়ে করে ফেলল হাসিব ও পারভিন। হাসিব পারভিনকে নিয়ে বাসায় চলে গেল। হাসিবের বাবা মা পারভিনকে মেনে নিল এবং প্রাণভরে দোয়া করলাে ওদের জন্য। রাতের বেলা দুজনের ছাদে বসে চাঁদ দেখছে। ওদের জীবনের আজ সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত। বিশেষ করে পারভিনের জীবনে। পারভিন হাসিবের কাঁধে মাথা রেখে অশ্রুসিক্ত হয়ে আপন মনে বলতে লাগলাে,

– তুমি আর তােমার বাবা-মা এত ভালাে কিভাবে হাসিব! তােমরা সত্যি অনেক মহান। জানাে হাসিব, আমি অনেক স্বপ্ন দেখতাম যে আমাকে কেউ ভালােবাসবে, আমারও স্বামী হবে। আমিও সংসার করবাে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার নিজেকে নিজে পাগলি ভাবতাম। কেননা এটা তাে কখনাে হবারই নয়। জানি না সৃষ্টিকর্তা হঠাৎ কেন এত সৌভাগ্য দিলেন আমার ভাগ্যে। আজ আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন। এমন খুশি একবার ছােট বেলাতে আমি হয়েছিলাম যখন মা আমার পছন্দের পুতুলটা আমাকে কিনে দিয়েছিল।

তখন থেকে আমি সারাদিন পুতুল নিয়ে খেলতাম। পুতুলকে খাওয়াতাম, গােসল করাতাম, ঘুম পড়াতাম। ঐ পুতুলটাকে আমার সন্তান হিসেবে দেখতাম। হঠাৎ একদিন বাবা এসে আমাকে প্রচুর ধমকালেন। বললেন, “ছেলে মানুষের এত পুতুল নিয়ে খেলা কিসের! ” বাবা আমার কাছ থেকে আমার পুতুলটা ছিনিয়ে নিলেন। আমি অনেক কান্না করলাম কিন্তু আমাকে দিলেন না। বাবা আমাকে বাইরে গিয়ে ছেলেদের সাথে খেলা করতে বলতেন। কিন্তু আমার ছেলেদের সাথে খেলা করতে মটেও ভালাে লাগতাে না। আমি ছেলে হলেও আমার ভিতরটা ছিল একটি মেয়ের মতাে।

আস্তে আস্তে আমি যত বড় হতে থাকলাম, আমার ভেতরের মেয়ে সত্ত্বাটাও বড় হতে লাগলাে। আমি মেয়েদের মতাে সাজুগুজু করতে লাগলাম। আমার চালচালন, কথা বার্তাতে দিন দিন মেয়েলিভাব প্রকট হতে লাগলাে। একসময়ে সবাই আমাকে হাফ লেডিস বলে ব্যঙ্গ করতে লাগলাে। তখন আমার খুব খারাপ লাগতাে। কান্না করতাম প্রচুর। মা বাবাকেও দেখতাম, তারা আমাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে আছে। আমি কাউকে বােঝাতে পারতাম না যে আমি আসলে মেয়ে । আমি ভাবতাম সৃষ্টিকর্তা আমার দেহকে ভুলে হয়তাে ছেলে দেহ বানিয়ে ফেলেছে।

একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবাে আমার শরীরটা মেয়ে মানুষের শরীর হয়ে গেছে, এমন আশা নিয়েই প্রতিরাতে ঘুমাতে যেতাম। কিন্তু সে আশা আর কখনাে পূরণ হয়নি আমার। আমি পড়ালেখাতে অনেক ভালাে ছিলাম । কিন্তু একদিন হেড স্যার আমার বাবাকে স্কুলে ডাকলেন। তারপরে বাবা আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন।

আমার যখন চৌদ্দ বছর বয়স তখন বাবা আমাকে এক হিজরা পল্লীতে দিয়ে আসলেন এবং বলে গেলন ঐ বাড়ির দরজা চিরতরে আমার জন্য বন্ধ। আমার খুব ইচ্ছে হতাে আমার মাকে দেখতে। কিন্তু দেখতে যেতে পারতাম না। আমার আদরের ছােট ভাইটাকে খুব মিস করতাম। জানি না এতাে দিনে সে কত বড় হয়ে গেছে। কিন্তু ইচ্ছাগুলাে অধরাই থেকে যেতাে।

আমি বাসার বাইরে গিয়ে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতাম। মা যদি কখনাে বাসার বাইরে বের হয় তবে মাকে দেখতে পাবাে। কিন্তু দেখা আর পাইনি। পরে জানতে পারলাম, তারা বাসা পাল্টিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। তাদের সন্তান হিজরা; সমাজের এই ধিক্কার তারা নিতে পারছিল না। হয়তাে। তাই আমাকে পরিত্যাগ করে দিয়ে তারা অন্যত্র চলে গেল।

আমি এমন হয়ে জন্মেছি এটা কি আমার দোষ, হাসিব? সৃষ্টিকর্তা আমাকে অর্ধেক অঙ্গ দিয়ে অর্ধাঙ্গিনী না বানালেও পারতেন। তােমাদেরকেও যিনি সৃষ্টি করেছেন, আমাদেরকেও তাে তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তবে আমি কেন এত ঘৃণিত, এত অবহেলিত সমাজের চোখে! আজ আমি যদি তােমাদের মতাে পড়ালেখা করার সুযােগ পেতাম তাহলে আমিও হয়তাে তােমার মতাে ভালাে চাকরি করতে পারতাম।

কিন্তু এই সমাজ আমাকে পড়তে দিল না। কেউ আমাদের চাকরি দেয় না। পেটের দায়ে মানুষের কাছ থেকে জোর-জবরদস্তি করে খেতে হয়।

জন্মেছিলাম মানুষ হয়ে, সমাজ আমাকে হিজরা বানিয়ে দিলাে।

Writer- Ankur Roy Anik
       Writer- Ankur Roy Anik

One thought on “অর্ধাঙ্গিনী | লেখক-অংকুর রায় অনিক

  1. অনেক ভালো একটা গল্প।
    ঠিক বাস্তব ওঠে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *